কেউ তাকে ডাকেন ‘রানী আপা’, কেউ বলেন ‘আমাদের মানুষ’। ভোটারদের রানী বলছেন, ‘আমার কোনো দল নেই, সংসার নেই। আপনাদের উন্নয়নে সারাক্ষণ নিবেদিত থাকবো।’
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে রংপুরের রাজনীতিতে ফের আলোচনার কেন্দ্রে হিজড়া প্রার্থী মোছা. আনোয়ারা ইসলাম রানী (৩৩)। এলাকার অলিগলি, হাটবাজার, শ্রমিকপাড়া আর ছিন্নমূল মানুষের বসতিতে দিনরাত ঘুরে বেড়াচ্ছেন—শুনছেন তাদের কষ্ট, আশা আর না পাওয়ার গল্প।
এই সরল উপস্থিতিই তাকে আলাদা করে তুলেছে রংপুর-৩ ((সিটি করপোরেশন আংশিক ও সদর উপজেলা) সংসদীয় আসনের অন্য প্রার্থীদের ভিড়ে।
এর আগেও তিনি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একই আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ঈগল প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করেছিলেন। এবার তিনি পেয়েছেন হরিণ প্রতীক।
এই আসনে আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের, বিএনপির প্রার্থী সামসুজ্জামান সামু, জামায়াতে ইসলামীর মাহমুদুর রহমানসহ বিভিন্ন দলের আরও পাঁচজন প্রার্থী। রংপুর-৩ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৫ লাখ ৮ হাজার ২২৩ জন। রংপুর সিটি করপোরেশনের ৯ থেকে ৩৩ নম্বর ওয়ার্ড এবং সদর উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এই আসন।
গত জাতীয় নির্বাচনে রানী পেয়েছিলেন ২৩ হাজার ৩৩৯ ভোট। ভোটের ফলাফল যাই হোক, ওই নির্বাচনে প্রান্তিক মানুষের সমর্থনে তার উত্থান রংপুরের রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছিল।
দ্য ডেইলি স্টারকে রানী বলেন, ‘আমি কোনো ক্ষমতার জোরে নয়, কোনো দলের ছায়ায় নয়—শুধু মানুষের ভালোবাসা, বিশ্বাস আর ন্যায়ের শক্তি নিয়েই এগোতে চাই। অবহেলিত মানুষের পাশে থাকাই আমার রাজনীতির মূল লক্ষ্য।’
‘আমি সুবিধাভোগী হতে রাজনীতি করতে আসিনি। এসেছি মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য, স্বাধীনভাবে কথা বলার জন্য। অবহেলিত কণ্ঠ যেন কেউ রোধ করতে না পারে—এই লড়াই সেই কারণেই। আমার কোনো সংসার নেই, কোনো পিছুটান নেই। তাই আমার পুরো সময়, শক্তি আর দায়বদ্ধতা আমি রংপুর-৩ আসনের মানুষের জন্যই দিতে চাই,’ যোগ করেন তিনি।
রানীর ভাষায়, ‘এই সংগ্রাম আমার ব্যক্তিগত নয়। এটি একটি মানবিক দায়, একটি ন্যায়ের আন্দোলন। কৃষক, শ্রমিক, নারী, তরুণ, বয়স্ক মানুষ, সংখ্যালঘু ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর সম্মান ও ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার নিয়েই আমার এই পথচলা।’
নগরীর আলমনগর এলাকার মুদি দোকানদার খলিলুর রহমান (৫৫) দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘তৃতীয় লিঙ্গের হয়েও আনোয়ারা ইসলাম রানী যে সংগ্রাম করে যাচ্ছেন, তা ইতিহাসে লেখা থাকবে। তিনি সবসময় অবহেলিত মানুষের পাশে থাকেন।’
নগরীর মডার্ন এলাকার গৃহকর্মী শাবানা বেগম (৪৫) বলেন, ‘রানী আপাকে আমার খুব ভালো লাগে। তিনি সবসময় আমাদের কথা বলেন। আমাদের কষ্ট বোঝেন। আমাদের এলাকায় কয়েকজন অসুস্থ হলে তিনি নিজে এসে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছিলেন।’
রংপুর নগরীর আলমনগর নুরপুর এলাকার বাসিন্দা রানী পেশায় একজন ব্যবসায়ী। হলফনামায় দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তার বার্ষিক আয় ৯ লাখ ১০ হাজার টাকা। হাতে তার নগদ অর্থ রয়েছে এক লাখ ৫০ হাজার টাকা। আর ব্যাংকে জমা ২৪ লাখ ৫৭ হাজার ৪৫২ টাকা।
অষ্টম শ্রেণি শেষ করা রানীর রয়েছে নিজের ব্যবহারের জন্য ৪০ লাখ টাকার একটি প্রাইভেটকার, ১৫ ভরি স্বর্ণ ও ৪০ ভরি রুপা। তার অস্থাবর সম্পত্তির মূল্য দেখানো হয়েছে ৬৬ লাখ ৭ হাজার ৪৫২ টাকা। আর স্থাবর সম্পদ রয়েছে ৮ শতাংশ অকৃষি জমি, যার বাজার দর দেখানো হয়েছে ১ কোটি ৮ লাখ টাকা।