আইসম্যানের তিন স্পর্শ

Date:

১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপটি ছিল এক বিশেষ আসর। শতাব্দীর শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে, সহস্রাব্দের সন্ধিক্ষণে, ফুটবল তখন এক নতুন যুগে প্রবেশ করছে। ফ্রান্সের মাটিতে সেবার মিলিত হয়েছিল বিশ্বের সেরা প্রতিভারা। রোনালদোর ব্রাজিল, জিদানের ফ্রান্স, বেকহামের ইংল্যান্ড, প্রতিটি দলেই ছিল তারকাদের ঝলকানি। সেই তারকামণ্ডলীর মধ্যে নেদারল্যান্ডস এসেছিল এক বিশেষ প্রত্যয় নিয়ে। গাস হিডিঙ্কের অধীনে ডাচ দলটি ছিল প্রতিভায় ভরপুর। প্যাট্রিক ক্লুইভার্ট, এডগার ডেভিডস, ফ্রাঙ্ক ও রোনাল্ড ডি বোর, ক্ল্যারেন্স সিডর্ফ, মার্ক ওভারমার্স, প্রত্যেকেই নিজ নিজ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমী। কিন্তু এই দলের মুকুটমণি ছিলেন ডেনিস বার্গক্যাম্প, যাকে ডাকা হতো ‘দ্য আইসম্যান’ বা বরফমানব বলে।

অপরদিকে আর্জেন্টিনা। দক্ষিণ আমেরিকার এই ফুটবল পরাশক্তি ড্যানিয়েল পাসারেলার কড়া শৃঙ্খলায় পরিচালিত হচ্ছিল। গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা, আরিয়েল ওর্তেগা, হুয়ান সেবাস্তিয়ান ভেরন, ক্লাউদিও লোপেজকে নিয়ে আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগ ছিল ধারালো ছুরির মতো। আর রক্ষণে ছিলেন রবার্তো আয়ালা, প্রচণ্ড মানসিক শক্তিসম্পন্ন এক রক্ষণভাগের যোদ্ধা, যাকে আক্রমণভাগের খেলোয়াড়েরা ভয় পেত তার নির্মম ট্যাকলিং আর অবস্থানগত বুদ্ধিমত্তার জন্য।

৪ঠা জুলাই, ১৯৯৮। মার্সেইয়ের স্তাদ ভেলোদ্রোম।

ভূমধ্যসাগরীয় গ্রীষ্মের উষ্ণ বাতাস বইছে স্টেডিয়ামের ওপর দিয়ে। ষাট হাজার দর্শক তাদের আসনে বসে অপেক্ষা করছেন ফুটবলের এক মহাযুদ্ধের জন্য। কমলা রঙের সাগরে ভেসে যাচ্ছে একদিক, অন্যদিকে আকাশী-সাদা ডোরাকাটা জার্সির স্রোত। ইউরোপ বনাম দক্ষিণ আমেরিকা, ফুটবলের চিরন্তন দ্বৈরথের আরেকটি অধ্যায় লেখা হতে চলেছে আজ রাতে।

ম্যাচ শুরু হলো এবং প্রথম থেকেই দুই দলের মধ্যে তীব্র লড়াই। প্রতিটি বলে যুদ্ধ, প্রতিটি ট্যাকলে আগুন। দ্বাদশ মিনিটে এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা। ক্লাউদিও লোপেজ একটি চমৎকার গোলে। আর পাঁচ মিনিট পরই ফ্রাঙ্ক ডি বোরের একটি ফ্রি কিক থেকে প্যাট্রিক ক্লুইভার্ট মাথায় করে সমতা ফিরিয়ে আনলেন। খেলা আবার সমান সমান।

এরপর থেকে ম্যাচটি হয়ে উঠল এক দাবা খেলা। দুই দলই জানত একটি ভুল মানে সর্বনাশ। আক্রমণ আর রক্ষণের মধ্যে এক সূক্ষ্ম ভারসাম্যের নাচ চলল। দ্বিতীয়ার্ধে খেলার গতি আরও বাড়ল, উত্তেজনা তীব্র হলো। আর্তুর নুমান লাল কার্ড পেলেন নেদারল্যান্ডসের হয়ে, আর আর্জেন্টিনার পক্ষ থেকেও ওর্তেগা লাল কার্ড পেয়ে বিদায় নিলেন গোলরক্ষক ফন ডার সারকে হেডবাট করার অপরাধে। দুই দলই দশজনে নেমে এলো। ম্যাচটি তখন ক্লান্ত, ভারী, যেন দুই ক্ষতবিক্ষত যোদ্ধা শেষ শক্তিটুকু দিয়ে একে অপরকে আঁকড়ে ধরে আছে।

১-১ গোলের সমতায় থাকা ম্যাচটি যখন অতিরিক্ত সময়ের ক্লান্তিকর গোলকধাঁধায় প্রবেশের অপেক্ষায়, ঠিক তখনই ডেনিস বার্গক্যাম্প নামের এক ডাচ শিল্পী তুলি হাতে তুলে নিলেন। তার সেই তুলির আঁচড় ফুটবল ইতিহাসে এমন এক মাস্টারপিস তৈরি করল, যা যুগ যুগ ধরে বিশ্বকাপের কিংবদন্তিদের গল্পে অমর হয়ে আছে।

ম্যাচের ঠিক ৮৯তম মিনিট। ডাচ ডিফেন্ডার ফ্রাঙ্ক ডি বোর নিজেদের অর্ধে বল পেলেন। তিনি চোখ তুলে তাকালেন। দেখলেন, দূর প্রান্তে আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগ চিরে ডান দিক দিয়ে দৌড় শুরু করেছেন বার্গক্যাম্প। ডি বোর তার বাঁ পায়ে প্রায় ৬০ গজ দূর থেকে একটি লং পাস দিলেন। বলটি মার্সেইয়ের আকাশ চিরে, যেন কোনো গাইডেড মিসাইলের মতো ছুটে চলল আর্জেন্টিনার পেনাল্টি বক্সের দিকে।

তীব্র বেগে ধেয়ে আসা সেই বলটিকে দৌড়ানো অবস্থায় নিজের আয়ত্তে নেওয়াটা ছিল প্রায় অসাধ্য এক সাধনা। ঘাড়ের ওপর তখন তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলছেন সেসময়ের অন্যতম সেরা ও ভয়ংকর আর্জেন্টাইন ডিফেন্ডার রবার্তো আয়ালা। কিন্তু বার্গক্যাম্প তো শুধুই একজন স্ট্রাইকার ছিলেন না, তিনি ছিলেন সবুজ মাঠের এক ঐশ্বরিক ভাস্কর।

এরপর যা ঘটল, তা বর্ণনা করার জন্য ফুটবলীয় অভিধান যথেষ্ট নয়; এর জন্য প্রয়োজন শিল্পের ভাষা। মাত্র ২.৭ সেকেন্ড এবং তিনটি নিখুঁত স্পর্শ, এইটুকু সময়েই বার্গক্যাম্প নিজেকে পরিণত করলেন এক অমর শিল্পীতে।

প্রথম স্পর্শ: শূন্যতার বুকে আভিজাত্য

আকাশ থেকে তীব্র বেগে ধেয়ে আসা বলটিকে নিজের আয়ত্তে নেওয়াটা ছিল প্রায় অসম্ভব। বার্গক্যাম্পের ঘাড়ে তখন নিঃশ্বাস ফেলছেন সেসময়ের অন্যতম সেরা আর্জেন্টাইন ডিফেন্ডার রবার্তো আয়ালা। কিন্তু বার্গক্যাম্প তো সাধারণ কোনো স্ট্রাইকার নন, তিনি ছিলেন সবুজ মাঠের জাদুকর। দৌড়ানো অবস্থাতেই তিনি ডান পা শূন্যে তুলে দিলেন। বলটি তার ডান পায়ের বুটে এমনভাবে চুমু খেল, যেন আকাশ থেকে খসে পড়া কোনো উল্কাপিণ্ডকে তিনি পরম মমতায় মখমলের চাদরে লুফে নিলেন। বলটি একবিন্দুও ছিটকে গেল না, একেবারে নিখুঁতভাবে তার পায়ের কাছে এসে শান্ত হলো। এটি ছিল প্রথম জাদু।

দ্বিতীয় স্পর্শ: বিভ্রান্তির মোহজাল

বল রিসিভ করার পর মুহূর্তেই দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ। আয়ালা ততক্ষণে ট্যাকল করার জন্য প্রস্তুত। কিন্তু বার্গক্যাম্পের মস্তিষ্ক তখন কাজ করছে অন্য কোনো গ্রহে বসে। প্রথম স্পর্শে বলটি নামিয়েই, দ্বিতীয় স্পর্শে ডান পায়ের ভেতরের অংশ দিয়ে বলটিকে আলতো করে নিজের বাঁ দিকে টেনে নিলেন তিনি। এই একটি মাত্র আলতো টোকায় আয়ালা যেন মুহূর্তের মধ্যে শূন্যতায় হারিয়ে গেলেন। স্লাইড করে আয়ালা ছিটকে গেলেন ফ্রেমের বাইরে, আর বার্গক্যাম্প পেয়ে গেলেন তার কাঙ্ক্ষিত জায়গা।

তৃতীয় স্পর্শ: শিল্পীর শেষ আঁচড়

আয়ালা পরাস্ত, কিন্তু সামনে তখনো দুর্ভেদ্য দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন আর্জেন্টাইন গোলরক্ষক কার্লোস রোয়া। কোণটা ছিল অত্যন্ত দুরূহ। কিন্তু শিল্পীর চোখে তখন সবকিছু যেন মায়াবী এক ধীরলয়ে চলছে। বলটি মাটিতে পড়ার আগেই, ডান পায়ের বাইরের অংশ দিয়ে বার্গক্যাম্প যে শটটি নিলেন, তা ছিল জ্যামিতি ও পদার্থবিদ্যার এক অদ্ভুত সুন্দর সংমিশ্রণ। বলটি রোয়াকে বোকা বানিয়ে, হাওয়ায় সামান্য বাঁক খেয়ে সোজা আশ্রয় নিল গোলপোস্টের বাঁ দিকের একেবারে ওপরের কোণায়। জালের প্রতিটি সুতো কেঁপে উঠল, আর সেই সাথে স্তব্ধ হয়ে গেল গোটা ফুটবল বিশ্ব।

গোল। ২-১। ৮৯তম মিনিট।

সেই মুহূর্তে স্তাদ ভেলোদ্রোম যেন বিস্ফোরিত হলো। কমলা রঙের জোয়ার উঠল গ্যালারিতে। ডাচ সমর্থকেরা একে অপরকে জড়িয়ে ধরলেন, চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। আর্জেন্টাইন খেলোয়াড়েরা হাঁটু গেড়ে বসে পড়লেন, তাদের চোখে অবিশ্বাস, মুখে শূন্যতা। তারা বুঝতেই পারলেন না কী হলো, কীভাবে হলো। এক মুহূর্ত আগেও যে ম্যাচ অতিরিক্ত সময়ের দিকে যাচ্ছিল, তা হঠাৎ করেই শেষ হয়ে গেল, বার্গক্যাম্পের তিন স্পর্শের জাদুতে।

আর বার্গক্যাম্প নিজে?

তিনি গোল করার পর দৌড়ে গেলেন কর্নার ফ্ল্যাগের দিকে, তারপর মাটিতে শুয়ে পড়লেন। দু’হাতে মুখ ঢাকলেন। সেই ছবিটি আজও ফুটবলের অন্যতম আইকনিক মুহূর্ত। মনে হচ্ছিল তিনি নিজেই বিশ্বাস করতে পারছেন না যা ঘটেছে। অথবা হয়তো তিনি সেই মুহূর্তটিকে, সেই পরিপূর্ণতার অনুভূতিটিকে, চোখ বুজে ভেতরে ধারণ করতে চাইছিলেন, যেভাবে একজন কবি তার শ্রেষ্ঠ কবিতাটি লেখার পর কিছুক্ষণ নীরব হয়ে বসে থাকেন, যেভাবে একজন চিত্রকর তার মাস্টারপিস সম্পন্ন করে কয়েক পা পিছিয়ে গিয়ে নিজের সৃষ্টিকে দেখেন। সতীর্থরা এসে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন, কিন্তু সেই সমস্ত উল্লাসের নিচেও বার্গক্যাম্পের মুখে ছিল এক শান্ত, প্রায় ধ্যানস্থ অভিব্যক্তি, বরফমানবের চিরচেনা মুখ।

ডাচ ধারাভাষ্যকার জ্যাক ভ্যান জেস্টের সেই রাতের কমেন্ট্রি আজও মানুষের কানে বাজে। বার্গক্যাম্পের গোলের পর তার কণ্ঠস্বর ভেঙে পড়েছিল আবেগে। “ডেনিস বার্গক্যাম্প! ডেনিস বার্গক্যাম্প! ডেনিস বার্গক্যাম্প!” তিনবার সেই নাম উচ্চারণ করেছিলেন তিনি, যেন প্রতিটি উচ্চারণ ছিল একটি স্পর্শের প্রতিধ্বনি। প্রথম উচ্চারণে বিস্ময়, দ্বিতীয়তে আনন্দ, তৃতীয়তে শ্রদ্ধা। সেই কমেন্ট্রি নিজেই হয়ে উঠেছে ফুটবল ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। আর বার্গক্যাম্প ও তার তিন জাদুকরী স্পর্শ তো বটেই।

Popular

More like this
Related

কারাগার থেকে প্রথম অনলাইন পোস্টে সমর্থকদের ধন্যবাদ মাদুরোর

যুক্তরাষ্ট্রের একটি কারাগার থেকে প্রথমবারের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বার্তা...

১২৯ ক্রীড়াবিদের জন্য মাসিক ভাতা, আসছে ‘স্পোর্টস কার্ড’

দেশের ক্রীড়াঙ্গনে নতুন এক সম্ভাবনার দ্বার খুলতে যাচ্ছে সরকার।...

ব্যর্থতার ছায়া কাটিয়ে নতুন মিশনে বাটলার

দুঃস্বপ্নের মতো কেটেছে সাম্প্রতিক টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। তবে সব হতাশা...

নিজেদের মতো সংবিধান ব্যাখ্যা করছে বিএনপি: নাহিদ ইসলাম

সংবিধানের ব্যাখ্যা নিয়ে বিএনপি সরকারের আচরণে দ্বিচারিতা রয়েছে বলে...